July 10, 2020, 12:18 am

গাইবান্ধায় সরকারের বিনামূল্যের ঘর পেতে লাখ টাকা ঘুষ

গাইবান্ধায় সরকারের বিনামূল্যের ঘর পেতে লাখ টাকা ঘুষ

এইচ আর হিরু, গাইবান্ধাঃ
গাইবান্ধার সাঘাটায় সরকারের বিনামূল্যের ঘর পেতে লাখ টাকা ঘুষ। সাঘাটায় সরকারের বিনামূল্যের ঘর পেতে লাখ টাকা ঘুষ।
গাইবান্ধায় হতদরিদ্রদের জন্য সরকারিভাবে তৈরিকৃত বিনামূল্যের ঘর বিতরণে ৭০ হাজার থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে সাঘাটা উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের প্রকল্প সভাপতি ও সদস্যদের বিরুদ্ধে। প্রকল্পের ওই কমিটিতে ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা সভাপতি ও মেম্বাররা সদস্যের দায়িত্বে রয়েছেন। এ তিন ইউনিয়নে মোট ২২টি ঘর বরাদ্দ। এর মধ্যে মুক্তিনগরে ৭টি, কচুয়ায় ৭টি ও ঘুড়িদহ ইউনিয়নে ৮টি।
হতদরিদ্রদের কষ্ট লাঘবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার এ ঘরগুলো বিনামূল্যে বিতরণের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু সরকারের এ সিদ্ধান্তকে তোয়াক্কা না করে ঘর প্রতি ৭০ হাজার থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে সাঘাটা উপজেলার মুক্তিনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আরশাদ আজিজ রোকন, মেম্বার আব্দুল ওয়াহেদ সাজু ও শামসুজ্জোহা, কচুয়া ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান, ঘুড়িদহ ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ ও মহিলা মেম্বার আঙ্গুর বেগমের বিরুদ্ধে। একই অবস্থা উপজেলার বাকি ৭টি ইউনিয়নেও।
হতদরিদ্রদের এসব ঘর নিয়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকার বাণিজ্য করেছেন চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা। ঘুষ বাণিজ্যের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষণ্ন করা হচ্ছে বলে মনে করছেন গাইবান্ধার সচেতন মহল। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে টিআর/কাবিটা কর্মসূচির আওতায় দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ প্রকল্পে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে গাইবান্ধার সাত উপজেলার ৮২টি ইউনিয়নে ৪২০টি ঘর নির্মাণের কাজ চলছে।
সরেজমিনে সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, সরকারের দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণের কাজ বেশ জোরেসোরেই চলছে। কোনো কোনো ঘরে ইটের গাথুনি চলছে। কোথাও আবার চলছে রংয়ের কাজ। কোনটি রং করার অপেক্ষায়। কোনোটির নির্মাণ কাজ শেষ।
২০১৯-২০২০ অর্থবছরের সরকারি ঘর পাওয়া সাঘাটা উপজেলার মুক্তিনগর ইউনিয়নের ধনারুহা গ্রামের স্বপ্না বেগম জানান, নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে তার স্বামী বিভিন্ন গ্রামে কাজ করেন। তার এক মেয়ে ঢাকায় গার্মেন্টস শ্রমিক। অভাবের সংসারে পাকা ঘরে থাকার ইচ্ছা থাকলেও নেই উপায়। এমন সময় মুক্তিনগর ইউপি সদস্য ও প্রতিবেশী আব্দুল ওয়াহেদ সাজু দেখালেন পাকা ঘরের স্বপ্ন। কম খরচেই মিলবে ঘর। দুটি পাকা রুম একটি রান্না-ঘর বাথরুমসহ সরকারের ডিজাইনের চেয়েও বেশি কিছু আছে বলে স্বপ্ন দেখানোর পরে দেড় লাখ টাকা ঘুষ চায়। তাই ধার দেনা করে ও নিজের জমানো টাকা, গার্মেন্টস কর্মী মেয়ের জমানো টাকা একত্রে করে মেম্বারের হাতে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা তুলে দেন তিনি। এরপর বছর যেতে না যেতে পেয়ে যান সরকারি ঘর।
এ ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামের একটি মসজিদের মুয়াজ্জিন আব্দুল হান্নান বেপারির স্ত্রী সোহাগিনী বেগম বলেন, আমরা ঘর নিয়ে কি যে ভুল করেছি নিজেও জানি না। একটি ঘর নিতে ইউপি চেয়ারম্যান আরশাদ আজিজ রোকনকে ৭০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।
২০১৯-২০২০ অর্থবছরের তালিকায় ধানঘড়া গ্রামের শুকুর উদ্দিনের নাম থাকলেও সরেজমিনে ঘরের মালিক দুদু মিয়া। দুদু মিয়ার স্ত্রী মঞ্জিলা বেগম জানান, গরু বিক্রি করে নগদ ৮০ হাজার টাকা দেই মুক্তিনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আরশাদ আজিজ রোকনের হাতে। সরকার নাকি বিনামূল্যে ঘর দেয় আমরা পেলাম কই।
মুক্তিনগর ইউনিয়নের ভরতখালি গ্রামে মৃত বাদশা মিয়ার ছেলে কফিল উদ্দিনের নাম থাকলেও ঘরের মালিক তার ছোট ভাই রফিকুল ইসলাম। ঘর নিতে কত টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে জানতে চাইলে রফিকুল ইসলাম জানান, এক লাখ ৮ হাজার টাকা মুক্তিনগর ইউনিয়নের মেম্বার শামসুজ্জোহার হাতে দিয়ে ঘর পেয়েছি।
অপরদিকে, সাঘাটার কচুয়া ইউনিয়নের নতুন ঘরের তালিকা শুরু হতে না হতেই টাকা নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রকল্প কমিটির সভাপতি মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে।
কচুয়া ইউনিয়নের উল্যাসোনাতলা গ্রামের ভ্যানচালক শাহজাহান আলী বলেন, আমি একটি ঘরের জন্য কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমানের কাছে ৯০ হাজার টাকা দিয়েছি। ঘরের কাজ শুরু হলে বাকি টাকা দিতে হবে।
ভ্যানচালক শাহ জাহান আলীর স্ত্রী মেলেনা বেগম জানান, আমার প্রতিবন্ধী মেয়ের জন্য একটি ঘর চেয়েছি। একটি ঘরের জন্য মোট এক লাখ ২০ হাজার টাকা চেয়ারম্যানকে দিতে হবে। এর মধ্যে ধার দেনা করে কিস্তি নিয়ে নগদ ৯০ হাজার টাকা দিয়েছি। তা নাহলে সরকারি ঘর দেয় না। কি করবো বাবা কিছু তো করার নেই।
কচুয়া ইউনিয়নের উল্যাসোনাতলা গ্রামের ভ্যানচালক চাঁন মিয়া জানান, মনে বড় আশা ছিল ইটের তৈরি পাকা ঘরে থাকবো। সরকারি পাকা ঘরের খোঁজ নিতে কচুয়ঢ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করলে চেয়ারম্যান এক লাখ টাকার দাবি করেন। পরে নগদ এক লাখা টাকার বিনিময়ে ঘর পেয়েছি।
সাঘাটা উপজেলার ঘুড়িদহ ইউপিরও একই চিত্র। চলতি অর্থবছরে সরকারি ঘর পাওয়া উপকার ভোগী ঘুড়িদহ ইউনিয়নের ছমিতন বেগম জানান, সরকারি একটি ঘরের জন্য ঘুড়িদহ ইউপি মহিলা মেম্বার আ্গংুর বেগম ও তার স্বামী মোফাজ্জল হোসেনের হাতে ৮০ হাজার টাকা দিয়েছি।
ঘুড়িদহ ইউনিয়নের ঝাড়াবর্ষা গ্রামের মোছামাৎ বেগমের ছেলে জাহিদুল ইসলাম জানান, একটি ঘরের জন্য ইউপি মেম্বারের সহযোগী মোহাম্মদ ভনডুলের হাতে ৮০ হাজার টাকা দিয়েছি। ঘর নির্মাণ কাজ শেষ এখন টিনের চালা লাগানো বাকি। কাজ শেষে আরও টাকা দিতে হবে।
এ ইউনিয়নের ঝাড়াবর্ষা গ্রামের খোতেজা বেগমের ছেলের বৌ দুলালী বেগম জানান, একটি ঘরের জন্য ঘুড়িদহ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল কামাল আজাদের কাছে ৭০ হাজার টাকা দিয়েছি। ঘরের নির্মাণ কাজ শেষ এখন বারান্দার কাজ বাকি আছে।
শান্ত মিয়া নামের এক নির্মাণ শ্রমিক জানান, সরকারি ডিজাইন অনুযায়ী আমরা যখন ঘরের নির্মাণ কাজ করি তখন উপকার ভোগীরা বাধা দেয়। সরকারের বিনামূল্যের ঘরের জন্য ঘুষের টাকা লেনদেনের কারণে প্রতিদিন লাঞ্ছিত হতে হয় নির্মাণ শ্রমিকদের। ডিজাইন অনুযায়ী কাজ করতে বাধার সম্মুখীন হয়ে বিঘ্ন হচ্ছে নির্মাণ কাজ।
বিনামূল্যের ঘর বিতরণে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে জানতে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার মুক্তিনগর ইউপি চেয়ারম্যান আরশাদ আজিজ রোকন, মেম্বার আব্দুল ওয়াহেদ সাজু ও শামসুজ্জোহা, কচুয়া ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান, ঘুড়িদহ ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ, মহিলা মেম্বার আঙ্গুর বেগমের সাথে মোবাইল ফোনে কথা হলে তারা সবাই অস্বীকার করেন।
ঘুষ নেয়ার অভিযোগে বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তিনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরশাদ আজিজ রোকন অস্বীকার করে বলেন, ঘর বিতরণ মেম্বাররা করে। তারা যে কিভাবে কি করেছে খোঁজ নিয়ে জানাবো।
একই ইউনিয়ন পরিষদের অভিযুক্ত মেম্বার অব্দুল ওয়াহেদ সুজা বলেন, আমি টাকা নিয়েছি লাখের উপর। কিন্তু সেটা মাটি কাটার জন্য ঘরের জন্য নয়। অপর মেম্বার শামসুজ্জোহা সরকার ঘুষ গ্রহণের কথা অস্বীকার করেন বলেন, সব মিথ্যা কথা।
কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রকল্প সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, আমাকে ফাঁসাতে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন। সরকারি ঘরের জন্য কোনো টাকা গ্রহণ করিনি।
অভিযোগ অস্বীকার করে ঘুড়িদহ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও গৃহ নির্মাণ প্রকল্প সভাপতি আবুল কামাল আজাদ বলেন, আমার সাথে ঘর বিতরণে কারও কোনো অনৈতিক লেনদেন হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে একই ইউনিয়নের মহিলা মেম্বার আঙ্গুর বেগম ফোন রিসিভ না করলেও তার স্বামী মোফাজ্জল হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ঘরটি আমার শালাকে দিয়েছি। কোন টাকা নেইনি।
এই বিষয়ে সচেতন মহলের মতামত নিতে গাইবান্ধার সমাজ সেবক ও সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম বাবু’র সাথে হলে তিনি জানান, “ সরকারের বিনা মুল্যের ঘরে যদি কোন জনপ্রতিনিধি ঘুষ বাণিজ্য করে থাকে তাহলে সরকারের ভাবমুর্তি খুন্ন হবে । তাই যথাযথ কর্তপক্ষকে এই বিষয়টি তদন্তপূর্বক প্রয়োাজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করে অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দরকার । তা নাহলে সরকারের সুনাম নষ্ট হবে। দেশের অগ্রগতিতে বাধা পরবে । ”
এ বিষয়ে সাঘাটা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকতা (পিআইও) মিঠুন কুন্ড বলেন, টিআর/কাবিটা কর্মসূচির আওতায় দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ প্রকল্পের ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ৪৬টি ঘর নির্মাণ শেষ ও চলতি ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ৭২টি ঘর নির্মাণের কাজ চলছে।
এ ব্যাপারে সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী চেয়ারম্যান মেম্বাররা উপকারভোগীর তালিকা দেয়। ঘর দেয়ার কথা বলে ঘুষ গ্রহণের প্রমান পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
একই প্রসঙ্গে গাইবান্ধা জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাসন কর্মকর্তা ইদ্রিস আলী বলেন, ঘর বিতরণে ঘুষ গ্রহণের কোনো অভিযোগ এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেনি। যদি কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী কর্মকতার মাধ্যমে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক (ডিসি) আব্দুল মতিন জানান, ঘর বিতরণে অনিয়ম হলে কোনো ছাড় নেই। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সব ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রসঙ্গত, জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী গাইবান্ধার ৭ উপজেলায় টিআর/কাবিটা কর্মসূচির আওতায় দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ প্রকল্পের ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ৪২০টি ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রতিটি ঘর নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮৬০ টাকা।

Please Share This Post in Your Social Media




© All rights reserved © 2017 Asiansangbad.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com