বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২১, ০৩:১৫ অপরাহ্ন

ইতিহাসে বিজয় দিবস ও পুরাণ কথা বিশ্লেষণ

ইতিহাসে বিজয় দিবস ও পুরাণ কথা বিশ্লেষণ

অ আ আবীর আকাশ
বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময় দিন ১৬ই ডিসেম্বর। আমাদের মহান বিজয় দিবস। বাঙ্গালী জাতির মহান বিজয়ের দিন। এইদিনে বিশ্বের মানচিত্রে সৃষ্টি হয়েছিল নতুন সার্বভৌম একটি দেশ নাম তার বাংলাদেশ। বিজয়ের ৪৮ বছর পূর্ণ হল৪৯ বছরে পা পড়লো। শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিত্বে প্রায় দেড় হাজার মাইলের দূরবর্তী দুটি ভৌগোলিক এলাকা নিয়ে একটি রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারেনা এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। ৫৫ হাজার বর্গমাইলের এই চির সবুজ দেশে ৪৮ বছর আগে এইদিনে উদয় হয়েছিল হাজার বছরের বহু কাংক্ষিত স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠ সূর্য। সেই দিনের সেই সূর্যের আলোয় ছিল নতুন দিনের স্বপ্ন, যে স্বপ্নের জন্য অকাতরে প্রাণ দিয়েছিল এদেশের ৩০ লাখ দেশপ্রেমিক। ৪৮ বছর পরও সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পায়নি,শেষ হয়নি মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রাম,জীবনের অন্তিম মূহূর্তে এসেও জীবন সংগ্রামে আজও লড়ছে অনেক মুক্তিযোদ্বা।
বিজয়ের আনন্দের এই দিনে শহীদ পরিবারের সদস্যদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আজও থামেনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ে শোনে মোনাজাত করেছে সত্যিকারের দেশপ্রেমিকরা। নয় মাস রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর লাখো প্রাণের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের দিনে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা। জাতি গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার সাথে স্মরণ করবে সেই সব শহীদদের, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা।
স্মরণ করবে সেই সব বীরসেনানীদের, যারা শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে অনাগত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুখীসমৃদ্ধ বাংলাদেশ উপহার দেয়ার জন্য প্রাণের মায়া ত্যাগ করে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। যেসব নরনারীর সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে আমরা আজ স্বাধীন, তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সম্মান জানানো হবে। বাংলার শোষিত-বঞ্চিত মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে বর্বর এক হত্যাযজ্ঞের অপারেশনে নামে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি হঠকারী শাসকগোষ্ঠী।
এরপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিলো আমাদের ওপর। শুরু হলো মুক্তির লড়াই, মুক্তিযুদ্ধ। ক্ষোভে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান। একাত্তরের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’ জনগণের স্বাধীনতার স্পৃহাকে প্রবল করে তোলে। ঢাকা যখন অগ্নিগর্ভ, তখন পাকিস্তানি শাসকচক্র আমাদের মুক্তির স্পৃহাকে সামরিক বুটের তলায় নিশ্চিহ্ন করার পথ বেছে নেয়।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সকালে জাতিসংঘ শরনার্থী বিষয়ক হাইকমিশন কর্মকর্তা জন আর কেলি সেনানিবাসের কমান্ড বাংকারে পৌঁছান। সেখানে নিয়াজীকে পাওয়া যায়নি,বিবর্ণ ও বিধ্বস্ত অবস্থায় ফরমান আলীকে পাওয়া গেল।ফরমান আলী জানায়,আত্নসর্মপণ সংক্রান্ত মুক্তি বাহিনীর সব প্রস্তাব তারা মেনে নিয়েছেন,কিন্তু তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ায় ভারতে সেই প্রস্তাব তারা পাঠাতে পারছেন না। তখন কেলি প্রস্তাব দেন,জাতিসংঘের বেতার সংকেত ব্যবহার করে তিনি বার্তা পৌছে দিতে পারেন।
আত্নসমর্পণের জন্য বেধে দেয়া সময় সকাল সাড়ে ৯টা থেকে আরোও ৬ ঘন্টা বাড়ানো ছাড়া মুক্তি বাহিনীর সব প্রস্তাব মেনে নিয়ে আত্নসমর্পণের বার্তা পৌছে দেয়া হয় জাতিসংঘের বেতার সংকেত ব্যবহার করে। তখন সকাল ৯টা ২০ মিনিট বাজে। কলকাতা ৮ নং থিয়েটার রোডের (বর্তমান শেক্সপিয়ার সরণী) একটি দুতলা বাড়িতে তখন বাংলাদেশ সরকারের সচিবালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর।১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সকাল বেলা বরাবরের মতই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কক্ষের দরজাটা একটু খোলা ছিলো।
বেশি টেনসান করলে প্রধানমন্ত্রীর অভ্যাস ছিল হাতের আঙ্গুল কামড়ানো। সেদিন ও তাই করছিলেন। সকাল ১০টার সময় হঠাৎ প্রধানমন্ত্রীর ফোনটি বেজে উঠলো। কিছুক্ষণ ফোনে কথা বলার পর প্রধানমন্ত্রী চোখে মুখে আকাশ ছোঁয়া আনন্দ নিয়ে সবাইকে জানালেন আজ আমরা স্বাধীন। বিকাল চারটায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিজয়ের খবরটি সবাইকে শোনালেন। আর বললেন আমাদের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হলো মাত্র। এখন দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে সবাইকে। বিজয়ের নিশ্চিত খবর ঢাকায় এসে পৌঁছেছে কিছুক্ষণ আগে। আত্মসমর্পণ হবে বিকাল সাড়ে চারটায়। খুশিতে আত্মহারা ঢাকাবাসী। সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে বীর মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকায় এসে প্রবেশ করেছে বিজয়ীর বেশে।এর আগেই মিরপুর ব্রিজ দিয়ে ঢাকায় এসে পৌঁছেছে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। পৌষের সেই পড়ন্ত বিকেলে ঢাকার রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)প্রস্তত হলো এক ঐতিহাসিক বিজয়ের মূহুর্তের সাক্ষী হওয়ার জন্য। বিকাল ঠিক ৪ টা ৩১ মিনিটে ৯১ হাজার ৫৪৯ জন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী নিয়ে জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করেন। মেজর জেনারেল জ্যাকবের তৈরি আত্মসমর্পণ দলিলে সই করলেন জেনারেল নিয়াজী ও লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর পরাজয় মেনে নেয়া পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। অর্জিত হয় আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। জন্ম নিল একটি নতুন দেশ বিশ্বের মানচিত্রে। নাম তার “বাংলাদেশ”!
বিজয়ের এত বছর পরও ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে বাংলার আকাশে বাতাসে শুরু হয় আনন্দের নতুন আভাস। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাংলাদেশের আকাশে উড়ে স্বাধীন পতাকা আর বাতাসে ভেসে বেড়ায় দেশাত্মবোধক গানের সুর। যে গান শুনে অনুপ্রাণিত হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধারা। সারা দেশের আনাচে কানাচে সর্বত্রই হয় নানারকম স্বাংস্কৃতি অনুষ্ঠান।
তথ্যসূত্র : বিভিন্ন গণমাধ্যম, ইন্টারনেট,বই ও ম্যাগাজিন।

Please Share This Post in Your Social Media




© All rights reserved © 2017 Asiansangbad.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com