রবিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২১, ০১:৪৯ অপরাহ্ন

যে যুদ্ধ হিরোশিমাকেও ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বের জন্য হুমকি!

যে যুদ্ধ হিরোশিমাকেও ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বের জন্য হুমকি!

অ আ আবীর আকাশ
যেখানে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হচ্ছে সেখানে গোটা পৃথিবীকে মারাত্মক হুমকিতে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্রে রয়েছে ভারত আর পাকিস্তান। কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান চলমান উত্তেজনায় যুদ্ধ বেধে গেলে পরিণতি কী হবে গোটা পৃথিবীর জন্য তা নিয়ে সম্প্রতি গবেষকরা এক গবেষণার মডেল দিয়েছেন। গবেষণায় বলা হয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের পারমানবিক বোমা বিস্ফোরণের ফলে আকাশে তৈরি হওয়া ঘন মেঘ ফুঁড়ে সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছতে পারবে না। এতে শস্য ফলবে না। ফলে বিশ্বজুড়ে গণহারে মৃত্যু হবে কোটি কোটি মানুষের। তখন বিশ্বের তাপমাত্রা এতটাই বেড়ে যাবে যা বরফ যুগের পরে আর কখনো দেখা যায়নি।
ভারত ও পাকিস্তান কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে যদি যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দেয় তাহলে এর পরিণতি কী হবে তা নিয়ে গবেষণার মডেল তৈরি করা হয়েছে। এতে উপরে উল্লেখিত চিত্রায়ন ঘটবে বলে গবেষকরা পূর্বাভাস দিয়েছেন। সম্প্রতি গবেষণা মডেলটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স এ্যাডভান্সেস এ প্রকাশিত হয়।
চরম উদ্যোগ সৃষ্টিকারী এই গবেষণা মডেল বিশ্বের তাবৎ চিন্তাশীলদের মাথায় হাত পড়েছে। ভারত পাকিস্তানের মধ্যে চলমান কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে যদি এদু’দেশ যুদ্ধে লিপ্ত হয় তাহলে কেবলমাত্র ভারত-পাকিস্তান নয় সারা পৃথিবীকেই এর খেসারত দিতে হবে। কি হবে তামাম পৃথিবীতে থাকা শান্তিপ্রিয় মানুষের? উত্তর প্রজন্মের খাদ্যসঙ্কটে যোগান কি হবে? অনাগতদেরই ভাগ্যে কি লেখা আছে? এমন কোন প্রশ্নের উত্তর নেই পৃথিবীর কোন চিন্তাশীলদের কাছে। শুধুমাত্র শান্তিময় পৃথিবীকে শান্ত রাখতে ভারত ও পাকিস্তান কাশ্মীর নিয়ে বিদ্যমান হাঙ্গামাকে ভুলে একটা শান্তিপ্রিয় সমঝোতায় আসতে পারে। এতে কোন পক্ষের হয়তো ছাড় দিতে হতে পারে। তাতে করে মানুষ হত্যা, খাদ্যসংকট এমনকি পৃথিবীকে ভয়াবহতার দিকে ধাবিত না করে তারা একে অপরের বন্ধু রাষ্ট্র হতে পারে।
২০২৫ সালের বরাত দিয়ে গবেষকরা বলছেন ‘যদি পাকিস্তানি জঙ্গিরা ভারতের পার্লামেন্টে হামলা চালায়, তবে বেশিরভাগ নেতাই খুন হবেন। এতে নয়াদিল্লি প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের ভারতীয় বাহিনীকে প্রতিহত করতে ইসলামাবাদ পারমানবিক অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এর ফলে বিশ্ব ইতিহাসে স্মরণকালের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাতে মারা যাবে সাড়ে ১২ কোটিরও বেশি মানুষ।
এই নিয়ে গত ৫ আগস্ট ভারত সরকার সংবিধানের ৩৭০ ধারা রদ করে জম্বু কাশ্মীর বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে। এই নিয়ে পারমাণবিক শক্তিধর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বেড়েছে। এই উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে ওই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাকাজে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির রুটজার্স ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক এলান রোবক। উপমহাদেশের চিরশত্রু দেশ দুইটির দেড়শতাধিক পারমাণবিক বোমা রয়েছে। ২০২৫ সালে এই পারমাণবিক বোমার সংখ্যা দাঁড়াবে দু’শর বেশি। গবেষকরা বলছেন দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটা সত্যি যে কাশ্মীর ইস্যুকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ আসন্ন। বর্তমান সময়েও কাশ্মীরকে নিয়ে দু’দেশের মধ্যে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে সীমান্তে মানুষ মারছে, গোলাগুলি চলছে।
কাশ্মির সীমান্তে ভারত ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটছে। এক্ষেত্রে গবেষণার মডেলে উল্লেখ করা হয় বিদ্যমান সংঘাতে প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার নয় এমন নীতি থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে ভারত। পাকিস্তানও ঘোষণা দিয়েছে। তবে প্রচলিত অস্ত্র যুদ্ধে না পেরে উঠলে কিবা সংঘাত আরও ঘনীভূত হলে দু’দেশের মধ্যে পাকিস্তানই প্রথম পারমাণবিক বোমা হামলা চালাবে। এ পারমাণবিক যুদ্ধে জনগণ ও নগরকেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করা হবে। তারপর ভারত তখন তাদের ভান্ডারে থাকা সবচেয়ে উন্নত অস্ত্র ব্যবহার করলে সাড়ে ১২ কোটিরও বেশি মানুষ মারা যাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাড়ে সাত কোটি থেকে ৮ কোটি মানুষ মারা যায়। বর্তমানে ১০০ কিলোটন অস্ত্র হিরোশীমায় ফেলা বোমার চেয়ে ৬গুণ শক্তিশালী। আকাশ থেকে এই ধরনের একটি বোমা ফেলা হলে ২০ লাখ মানুষ নিহত এবং ১৫ লাখ মানুষ আহত হবে। তবে বেশিরভাগ মানুষ মরবে বিস্ফোরণের পরে সৃষ্ট আগুনের ঝলকানিতে।
তাহলে কি এর সংঘাত যুদ্ধে হিরোশিমাকেও হার মানাবে? ক্ষুদ্র একটি ভুলের কারণে হিরোশিমা অধ্যবধি মহাবিশ্বের মহালজ্জা।পরিণত হয়েছে ইতিহাসের কলঙ্কময় অধ্যায়। সৃষ্ট হওয়া অপূরণীয় ক্ষতি থেকে আজ পর্যন্ত জাপান নাগাসাকি বেরিয়ে আসতে পারেনি। সেখানে এশিয়া মহাদেশে মেতে উঠতে চায় ভারত ও পাকিস্তান। তারা কি পারে না এ ধরনের ভুলের হাত থেকে বেরিয়ে আসতে? যেহেতু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। তবে বেরিয়ে আসলে যেমন সুবিধা হবে উভয়ের জন্য তেমনি যুদ্ধে লিপ্ত হলে শুধুমাত্র তারা নিজেদের ক্ষতিই ডেকে আনবে না, সাথে করে তামাম পৃথিবীর জন্য এক অবর্ণনীয় দুর্যোগ ও হাহাকার নিয়ে আসবে।
গবেষণায় বলা হয়েছে যুদ্ধে পাকিস্তানের চেয়ে ভারতের ক্ষতি হবে দুই থেকে তিন গুণ বেশি। কারণ ভারতের চেয়ে পাকিস্তানই বেশি পারমানবিক বোমা ফেলবে। এদিকে ভারতের আয়তন বড় হওয়ায় তাদের রয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। তাতে করে পাকিস্তানের লক্ষ্য থাকবে জনবসতিপূর্ণ এলাকা ও শহর। প্রাণহানি ঘটবে সীমাহীন।
পারমাণবিক যুদ্ধ হলে যে শুধুমাত্র যে এলাকায় বোমা পড়বে সে এলাকারই ক্ষয়ক্ষতি হবে তা নয়, তার খেসারত দিতে হবে গোটা বিশ্বকেই। বোমার আঘাতে, আগুনের ঝলকানিতে যেভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে ভারত, পাকিস্তান, কাশ্মীর তাতে সৃষ্ট ধোয়ায় ছাই, আগুন, বায়ুমণ্ডলের উপরে দেড়কোটি থেকে ৩ কোটি ৬০ লাখ টন কালো কার্বন সৃষ্টি করবে। যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যাবে। ফলে কালির পুরু,স্তর সৌর বিকিরণ পুরোটাই শুষে নেবে,বায়ু গরম এবং জমাট কালো হবে। মেঘের পরিমান বাড়বে দ্রুত গোটা বিশ্বের বিশাল একটি অংশে সূর্যের আলো পৌঁছাবে না বিন্দুমাত্র। এসবের কারণে সূর্যালোকের ২০ থেকে ৩৫ পার্সেন্ট আলো কম পৌঁছবে পৃথিবীতে। যার জেরে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কমে যাবে ২ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যাবে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ। তার প্রভাব ফসলের উৎপাদন কমে যাবে। যা বিশ্বে তীব্র খাদ্য সংকট সৃষ্টি করবে।
সময় থাকতে যদি ভারত ও পাকিস্তান কাশ্মীর সংকট সমঝোতার মাধ্যমে সম্পন্ন না করে তাহলে এই দুর্যোগের দিকে ভারত পাকিস্তানি নয় এশিয়া মহাদেশের সাথে গোটা পৃথিবীকে ধাবিত করবে। একদিকে যেমন পৃথিবী হবে ধ্বংসস্তুপ বিরানভূমি অন্যদিকে হতাহত হওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ থাকবে না। লাশ মাটিচাপা দেওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা থাকবে না। হাসতে হাসতে খেলতে খেলতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান সংঘাত ক্রমান্বয়ে এরকম একটা ভয়ানক যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে। তাতে করে এর পরিণতি কত ভয়াবহ তা টের পেলেও বিশ্ব নেতারা এখনো নিশ্চুপ রয়েছেন অদৃশ্য কারণে। গোটা পৃথিবীর জন্য ভারত-পাকিস্তান এখন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের দু’দেশের হেয়ালিপনা কেন গোটা বিশ্বের মানুষ মাসুল দেবে? সময় থাকতে ভারত-পাকিস্তানকে শান্তির পথে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব জাতিসংঘ করতে পারে। তারা উভয় দেশের মধ্যে বিদ্যমান সংঘাত দূর করে একটি বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী দেশ হিসেবে উভয়ের মধ্যে শান্তিচুক্তি করাতে পারে। যদি অল্প সময়ের মধ্যে এরকম একটা যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয় তাহলে পরিণতি গোটা বিশ্বকেই ভোগ করতে হবে।
লেখক : কবি প্রাবন্ধিক ও কলামলেখক।

Please Share This Post in Your Social Media




© All rights reserved © 2017 Asiansangbad.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com