বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২১, ০৯:০০ অপরাহ্ন

বৈধ আমদানি হলো কিভাবে অবৈধ ক্যাসিনো সামগ্রী?

বৈধ আমদানি হলো কিভাবে অবৈধ ক্যাসিনো সামগ্রী?

   অ আ আবীর আকাশ : দেশের রাজধানী ঢাকাতে ক্যাসিনো বিরোধী সফল অভিযানে দেশ ও দেশের বাহিরেও সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। ক্যাসিনো ক্লাব বাকারা ও রুলেট মেশিন বিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখতে বিভিন্ন মহল থেকে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে।
চলমান অভিযানে অনেকে গ্রেপ্তার হলেও শীর্ষস্থানীয় আমব্রেলা এমনকি সরকারের শীর্ষস্থানে থাকা উল্লেখিত অভিযোগে যুক্ত থাকা ব্যক্তিরা এখনও ধরা পড়ছে না। খালেদ তথ্য দিলেও বা দেয়ার পরেও রাঘববোয়ালদের গ্রেফতার না করাটাকে রহস্যের ধুম্রজাল সৃষ্টি করেছে।
সম্রাট সরাসরি ক্যাসিনো ব্যবসার নায়ক থাকলেও তাকে গ্রেফতার করছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাকে কেন গ্রেফতার করছে না এ প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন -‘সম্রাটকে গ্রেপ্তার করলে জানানো হবে।
জনমনে এতে করে নানা প্রশ্নের উদ্রেগ সৃষ্টি হয়েছে। সম্রাট কি দেশে আছেন? তাকে কি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নজরে রেখেছেন? নাকি সম্রাট একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে তবিয়তেই আছেন?
উত্তর না মিললেও সম্রাটদের মতো এমপি মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী এমনকি দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ বহন করা অনেক ব্যক্তিও এসব ব্যবসার হোতা হিসেবে নাম এসেছে। দেড় হাজার কোটি টাকা ঘুষ প্রদানকারী জিকে শামীম ইতিমধ্যে অনেকের নাম প্রকাশ করেছেন। ক্যাসিনো রুলেট এর কথা বলতে গিয়ে জিকে শামীমকে ইতোমধ্যে আমরা আলোচনার টেবিল থেকে একটু দূরে রাখতে চলেছি!
প্রশ্ন হচ্ছে ক্যাসিনো রুলেট ক্লাব ও বাকারা যদি নিষিদ্ধ হয় তাহলে দেশে আমদানি হল কিভাবে?
আমদানিকারকরা সরকারের সকল নিয়ম মেনে এসব ক্যাসিনো উপকরণ দেশে আমদানি করেছেন বলে তারা জানান। ক্যাসিনোর আরেক নায়ক লোকমান  পুলিশের রিমান্ডে জানিয়েছেন তিনি শুধু ক্লাব ভাড়া দিতেন। এতেই তার প্রতি রাতে ২১ লাখ টাকা আয় হতো। রাশিয়ার একটি ব্যাংকে তার ৪১ কোটিরও বেশি টাকা জমা রয়েছে। এ টাকা ফিরে আনার জন্য সরকারের কোনো তৎপরতা এখনো চোখে পড়েনি।
অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসাসহ নানা অপরাধের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত গ্রেফতারকৃত যুবলীগ নেতা খালেদ এবং ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও বিসিবি পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া পুলিশ রিমান্ডে ইতোমধ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন বলে শনিবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তাদের রিমান্ডে বেরিয়ে এসেছে সাবেক ও বর্তমানের যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের অনেক নেতার নাম এমনকি বর্তমান ও সাবেক এমপি মন্ত্রীর নাম এসেছে। এসব কারণে এখন অনেক আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতারা আতঙ্কে দিন পার করছেন। অনেকে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হওয়ারও আগাম সংবাদ দিচ্ছেন গণমাধ্যমে।
যুবলীগ নেতা রিমান্ডে জানিয়েছেন -মতিঝিল এলাকায় কার সহায়তায় ক্যাসিনো চালাতেন, কারা কারা এই ক্যাসিনোর টাকার ভাগ নিতেন, কোন কোন নেতার সঙ্গে মিলে খালেদ এই ব্যবসা চালাতেন, কতদিন ধরে এই ব্যবসা চলছে, কাদের মাধ্যমে ক্যাসিনোর মালামাল দেশে আনা হয়, কার পৃষ্ঠপোষকতায় ক্যাসিনো চালানো হতো, থানা পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের ক্যাসিনো থেকে কত টাকা ভাগ দিতে হতো এসব তথ্য বের হচ্ছে খালেদের মুখ থেকে। খালেদ সুস্পষ্টভাবে সবার নাম বললেও তদন্ত স্বার্থে গণমাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের নাম প্রকাশিত হয়নি। এছাড়াও ক্যাসিনোর ব্যবসার সাথে ঢাকার দক্ষিণে যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট সহ অনেক যুবলীগ নেতার নাম বের হচ্ছে যারা তাকে ক্যাসিনো চালাতে সহায়তা করেছেন, টাকা নিয়েছেন। তবে লোকমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর অনেক নেতাই এখন গা-ঢাকা দিয়েছেন, অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
ক্যাসিনো ব্যবসার নামে দেশে যে হারে মানিলন্ডারিং হচ্ছে, অপকর্ম বাড়ছে, জুয়া খেলে বহু নারী-পুরুষ ধ্বংস হয়েছে তাতে করে ক্যাসিনো আমদানিকারক,ক্লাব মালিক তথা রাজনৈতিক নেতাদের মনে একবারও সহানুভূতি জাগলো না। দেশ ও দেশের মানুষের কথা ভাবলো না তারা। এতে করে বোঝা যাচ্ছে রাজনীতি করা মানে নিজের আখের গোছানো।
‘প্রায় এক বছর আগে ঢাকার গুলিস্তানে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে এয়ারকন্ডিশনার বিক্রি করে এমন একটি দোকানে গিয়েছিলেন কয়েকজন নেপালি নাগরিক। সেখানে কথা বলার এক প্রসঙ্গে তারা জানতে চান এসি আমদানির মত করে কিছু ‘ রুলেট মেশিন’ আমদানি সম্ভব কিনা! দোকানদার বিষয়টি নিয়ে তার আমদানিকারকের সাথে যোগাযোগ করেন।
আমদানি নীতিমালায় রুলেট মেশিনের উপর কোন বিধিনিষেধ ছিল না ফলে তা আমদানি করতে রাজি হন  ওই আমদানিকারক এবং একটি মেশিন তিনি বৈধ ভাবে আমদানি করেন বলেও জানান। সেই নেপালিদের একজনের নাম উঠে এসেছে ক্যাসিনো বিরুদ্ধে অভিযানের সময়।’ সূত্র বিবিসি বাংলা।
ক্যাসিনো উপকরণ আমদানি করা হয়েছে আমদানি নীতিমালা অনুসরণ করেই এবং তা বৈধভাবেই  এমনটিই বলেন আমদানিকারকরা। তবে বিদেশ থেকে দেশের ওই সামগ্রী ঢাকার কমলাপুরে আসার পর কাস্টমস কর্মকর্তারা পরীক্ষা করেছেন, শুল্ক ঠিকভাবে দেয়া হয়েছে বলে জানা যায়। তারপর পণ্য খালাস করা হয়। এখানে একটি ক্যাসিনো উপকরণ ছিল পন্যটি অবৈধ ছিল না বলে জানান ওই আমদানিকারক। পন্যটির নাম রুলেট যা মূলত ক্যাসিনোতে জুয়া খেলার কাজে ব্যবহৃত হয়।
এ নিয়ে রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন- বাণিজ্যমন্ত্রণালয়ের আমদানি নীতিমালার সুযোগ নিয়েই রুলেট মেশিন টেবিল, ক্যাসিনো টেবিল, স্লট মেশিন আমদানি হয়েছে। কিন্তু তারপরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে ঢাকার বেশ কিছু ক্যাসিনোতে যন্ত্রটি দেখা যাওয়ার পর বৈধভাবে আমদানিকারকদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় এনেছেন, তা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য।
রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া অবশ্য বলেন- ক্যাসিনো সামগ্রী আমদানির পরিমাণ বেশি নয়। কালেভদ্রে আমদানি হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে- কতশত ক্যাসিনো দেশে গড়ে উঠলে রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বলবেন -ক্যাসিনো অবৈধ বা দেশে আনা ঠিক হয়নি। দেশের জন্য ধ্বংসাত্মক ক্যাসিনো মোশারফের মত কিছু লোকের কাছে নিতান্ত গৌণ হলেও জুয়া খেলার সামগ্রী স্বল্প আর বিহৎ কি? তার তফাৎ বোঝার জ্ঞান কি তার হয়েছে?
ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানে অংশ নেয়া কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন -‘ প্রচলিত জুয়ার বাহিরে ক্লাবগুলোতে অধিকসংখ্যক বাকারা মেশিন, ক্যাসিনো টেবিল, রুলেট মেশিন দেখেছেন।’ সূত্র সময়ের আলো। বাংলাদেশে আনা প্রতিটি রুলেট মেশিনের দাম ৭হাজার ডলার, ক্যাসিনো মেশিনের দাম ১০ হাজার ডলার।
আমাদের জনমনে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে কেবল-ই- ক্যাসিনো যদি বাংলাদেশে অবৈধ হয় তাহলে আমদানি নীতিমালায় কেমনে ক্যাসিনো সামগ্রি বৈধ হবে?  ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, পাড়ায় ক্যাসিনো গড়ে উঠছে কিভাবে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর নজর এড়িয়ে?  পুলিশ না হয় ব্যতিক্রম, তবে এনএসআই, ডিজিএফআই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও কি নজরে আসেনি? নাকি তারা রাঘববোয়াল ও নেতা-পেতা এমপি-মন্ত্রীর কাছ থেকে উপঢৌকন গ্রহণ করে অবলীলায় তা চলতে সহযোগিতা করতেন?
এতে করে কারো কাছে কোন সদুত্তর পাওয়া যায়নি আজ পর্যন্ত। তবে রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মোশাররফ বলেন- আমরা তো  ভাবিনি এত ক্যাসিনো গড়ে উঠবে! এসব অনেকের ধারণাতে আসেনি। একটা বিষয় হলো ট্রেড ফেসিলিটেশন মানে যত কম পণ্য আইটেম নিষিদ্ধ করা যায় ততই দেশের ট্রেড লিবারেল। সে কারণে যত কম পণ্য নিষিদ্ধ করা যায় সেভাবে নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। তবে ইতোমধ্যে ক্যাসিনো আমদানি ও ছাড় করার  উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে রাজস্ব বোর্ড।
জনগণের মানসকন্যা, জননেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান তথা দেশ ও দেশের উন্নয়নের স্বার্থে শুদ্ধি অভিযান চালানোয় দেশের আমজনতার কাছে যেমন সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে তেমনি বহির্বিশ্বেও অভিযানকে কেন্দ্র করে বিপুল সুনাম অর্জনে সক্ষম হয়েছেন।
জয় হোক ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান।দেশের স্বার্থে এ অভিযান অব্যাহত থাকুক।অভিযান ছড়িয়ে পড়ুক জেলা উপজেলা এমবকি প্রত্যান্তঞ্চলে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। সম্পাদক: আবীর আকাশ জার্নাল।

Please Share This Post in Your Social Media




© All rights reserved © 2017 Asiansangbad.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com