মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০৯:১৭ অপরাহ্ন

এই দিনে ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস ক্ষত-বিক্ষত করে দেয় উপকূলীয় জনপদ।

এই দিনে ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস ক্ষত-বিক্ষত করে দেয় উপকূলীয় জনপদ।

১২ নভেম্বর আজ (সোমবার)। এই দিনটি ভোলাসহ উপকূলবাসীর জন্য বিভিষীকাময় এক দুঃস্বপ্নের দিন। ১৯৭০ সালের এই দিনে প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস ক্ষত-বিক্ষত করে দেয় উপকূলীয় জনপদ। মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়  চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ভোলা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, খুলনাসহ উপকূলীয় ১৮টি জেলা। ৪৮ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও কান্না থামেনি উপকূলীয় এলাকার স্বজনহারা মানুষদের। ওই ঝড় জলোচ্ছাসে ৩০ লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ নিমিষেই শেষ হয়ে যায়। নিখোঁজ হয় কয়েক সহস্রাধিক।

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর দিনভর ছিল গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাস। সন্ধ্যার পর মুহূর্তের মধ্যেই প্রকৃতি এক ভয়ানক রূপ নেয়। রাতভর  ঝড় ও জলোচ্ছাসের তাণ্ডবে উপকূলীয় ১৮টি জেলা মৃত্যুপুরিতে পরিণত হয়। ঘর-বাড়ি, গাছ-পালা, গবাদি পশু, মাঠের ফসল নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যায়। এসবের সাথে ভেসে যায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ লাখ লাখ মানুষ।  সে সময় তথ্যপ্রযুক্তি দুর্বল থাকায় উপকূলে অনেক মানুষই ঝড়ের পূর্বভাস পায়নি। যার কারণে বাড়ি-ঘর ছাড়েনি মানুষ। জলোচ্ছাস হয়েছিল গড়ে প্রায় ১২ থেকে ১৪ ফুট উচ্চতায়। কেউ গাছের ডালে, কেউ উঁচু ছাদে আশ্রয় নিয়ে কোনোমতে প্রাণে রক্ষা পেলেও ১০ দিন পর্যন্ত তাদের অভুক্ত কাটাতে হয়েছে। হতদরিদ্রদের একমাত্র আয়ের উৎস্য গবাদিপশুগুলোও ভাসিয়ে নিয়ে যায় জলোচ্ছাসে। বেড়িবাঁধ, জলাভূমি, জঙ্গলসহ বিভিন্ন প্রান্তে স্বজনহারা মানুষগুলো তাদের প্রিয়জনের লাশও খুঁজে পায়নি। আর তাই বছর ঘুরে ফিরে আসা দিনটি আজও কাঁদায় উপকূলবাসীকে।

স্থানীয় উপকূলবাসীদের মতে, গত ৪৮ বছরের সব কটি ঘূর্ণিঝড়ের চেয়ে ১৯৭০ এর ঝড়টি সব চাইতে হিংস্র ও ধ্বংসাত্মক ছিল।  ভোলা কালিবাড়ি মক্কি মসজিদ রোডের বাসিন্দা মো. আলমগীর মিয়া জানান, তখন তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী। ঝড়ের সময় দৌলতখানে তার নানা বাড়ি অবস্থান করছিলেন। সেখানে ১০ ফুট পানি উঠে। তবে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। কিন্তু নানা বাড়ি থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে তাদের বাড়ি ঝড়ে সব লণ্ডভণ্ড করে ফেলে। ঝড়ের পরদিন তিনি মেঘনা নদীর তীরে তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখতে পায় চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। অলৌকিকভাবে তার মা বেঁচে গেলেও বাবা মারা যান। ছয় ভাই এক বোনের মধ্যে তিনজন বাঁচলেও বাকিরা মারা যায়। এছাড়া শুধু তাদের বাড়িরই ১৬ জন মারা যায়।

৭০ এর সেই ঝড়ের প্রত্যক্ষদর্শী ভোলা থেকে প্রকাশিত দৈনিক বাংলার কণ্ঠ সম্পাদক এম হাবিবুর রহমান বলেন, ঝড়ের পর দেখেছি সাপ আর মানুষ দৌলতখানের চৌকিঘাটে জড়িয়ে পড়ে আছে। স্নেহময়ী মা তার শিশুকে কোলে জড়িয়ে মেঘনার তীরে পড়ে রয়েছে। সোনাপুরের একটি বাগানে গাছের ডালে এক নারীর লাশ ঝুলছে। এমনিভাবে মনপুরা, চরফ্যাশন, লালমোহন, তজুমুদ্দিন ও দৌলতখানসহ সমগ্র জেলায় মানুষ আর গবাদি পশু বঙ্গোপসাগরের উত্তাল পানিতে ভেসে গেছে। ভোলায় তখন মানুষ শূণ্য হয়ে পড়েছিল। সেই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসে উপকূলীয় জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। নদীতে গবাদি পশুসহ মানুষের লাশ সারিবদ্ধভাবে পড়েছিল।

তিনি বলেন, এসব সংবাদ তৎকালীন ‘পূর্বদেশ’ পত্রিকার ভোলাস্থ প্রতিনিধি হিসেবে তার সচিত্র প্রতিবেদন ‘বাংলার মানুষ কাঁদো, ভোলার গাছে গাছে ঝুলছে মানুষের লাশ’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। আর এ সংবাদ বিশ্ব চারদিন পর জানতে পেরেছিল। সেই চিত্রটি আজও ঢাকা প্রেস ইনস্টিটিউটে কালের সাক্ষী হিসেবে বাঁধানো অবস্থায় প্রদর্শিত হচ্ছে।

এদিকে দিনটি স্মরণে আজ  (সোমবার) ভোলা প্রেস ক্লাবে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও র‌্যালির আয়োজন করা হয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media




© All rights reserved © 2017 Asiansangbad.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com