মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ০৭:৩৬ পূর্বাহ্ন

ইলিশের প্রজনন মৌসুম শেষ বড় ইলিশ ধরতে কোন বাঁধা নেই। 

ইলিশের প্রজনন মৌসুম শেষ বড় ইলিশ ধরতে কোন বাঁধা নেই। 

গত ৭ অক্টোবর থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত  ২২ দিন ছিল ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম। ইলিশের প্রজনন মৌসুম শেষ হওয়ার পর এখন মা ইলিশের ডিম থেকে উৎপাদিত জাটকা (ছোট সাইজের ইলিশ) রক্ষা করার সময়। আর তাই, প্রজনন মৌসুম শেষ হওয়ার তিনদিনের মাথায় দেশের সব নদ-নদীতে বৃহস্পতিবার থেকে ( চলতি বছরের ১ নভেম্বর থেকে আগামী বছরের ৩০ জুন) আট মাস জাটকা (২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দৈর্ঘের ইলিশ) ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এই আট মাস জাটকা ধরা, বিক্রয়, মজুদ ও পরিবহন সম্পূর্ণরুপে বন্ধ থাকবে। তবে বড় আকারের ইলিশ ধরতে কোন বাঁধা নেই।
এদিকে জেলেদের দাবি, সাগরে জাল ফেললে ছোট-বড় প্রায় সব সাইজের ইলিশ ধরা পড়ে। জালে মাছ বাঁধার পর আর ফেলে দেয়া হয় না। এ অবস্থায় ছোট ফাঁসের জাল উৎপাদন বন্ধের দাবি উঠেছে। একই সাথে জেলেরা জাটকা ধরা বন্ধ থাকাকালীন সময়ে প্রয়োজনীয় সাহায্যের দাবিও জানিয়েছেন।

মৎস্য বিভাগ জানায়,  সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এই সময়ে জাটকা ধরা বন্ধ রাখতে যে সব জেলেরা সাগরে গিয়ে ইলিশ আহরণ করে তাদেরকে খাদ্য সহয়তা দেবে সরকার। জাটকা ধরা বন্ধ করা গেলে আগামী মৌসুমে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলে মৎস্য বিভাগ আশা করছে।

বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জিয়া হায়দার চৌধুরী জানান, মা ইলিশ ডিম ছাড়ার পর তা পর্যায়ক্রমে রেনু, জাটকা এবং পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ ইলিশে পরিণত হয়। ডিম থেকে রেণু তৈরি হওয়ার পর পরিপূর্ণ ইলিশে পরিণত হতে প্রায় এক বছর সময় লাগে। তাই ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আটক মাস দেশের সব নদ-নদীতে জাটকা ধরা বন্ধ থাকবে। জাটকা রক্ষা করা গেলে আগামী মৌসুমে ইলিশের উৎপাদন পাঁচ লাখ মেট্রিকটনের বেশি হবে বলে তার আশাবাদ।

এই মৎস্য কর্মকর্তা বলেন,  জাটকা ধরা বন্ধ রাখতে জেলেদেরকে খাদ্য সহায়তা দেবে সরকার। জনপ্রতি প্রতি মাসে ৪০ কেজি করে বিনামূল্যে চাল পাবে জেলেরা। জাটকা রক্ষায় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা এবং মানুষকে আরও বেশি সচেতন করার কথা জানালেন ওই মৎস্য কর্মকর্তা।

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী,  দেশে ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে চার লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিটকটন এবং ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে পাঁচ লাখ নয় হাজার মেট্রিকটন ইলিশ উৎপাদন হয়েছে। আর চলতি বছর ইলিশের উৎপাদন আরও বেশি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. আনিচুর রহমান জানান, ইলিশ প্রায় সারা বছর জুড়ে ডিম ছাড়ে। বড় পূর্ণিমার এই সময়কে (৭ থেকে ২৮ অক্টোবর) ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম ধরা হয়। এই সময়ে ঝাঁকেঝাঁকে মা ইলিশ উপকূলের কাছাকাছি এসে ডিম ছাড়ে। একটি ইলিশ সর্বোচ্চ ২১ লাখ পর্যন্ত ডিম ছাড়ে। গড়ে একটি মা ইলিশ ১০ থেকে ১২ লাখ ডিম ছাড়ে বলে তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে। ওই ডিম থেকে প্রথমে রেণু এবং পরবর্তীতে জাটকায় (ছোট ইলিশ) পরিণত হয়। ইলিশ যে হারে ডিম ছাড়ে তার মধ্যে থেকে শতকরা পাঁচ ভাগ রেণু (বাচ্চা) বেঁচে থাকে। বাকি ডিম নানা ভাবে নষ্ট হয়ে যায়।

তিনি আরও জানান, ২২ দিন ইলিশ যে হারে ডিম ছেড়েছে তা যথেষ্ট। এখন জাটকা রক্ষা করতে হবে। মার্চ থেকে এপ্রিল এই দুই মাসে সব চেয়ে বেশি জাটকা ধরা পড়ে। সে ক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন হতে হবে। গত বছর গড়ে শতকরা ৪৬ ভাগ ইলিশ ডিম ছেড়েছে। এই প্রজনন মৌসুমেও প্রায় একই সংখ্যায় ইলিশ ডিম ছেড়েছে বলে তিনি মনে করেন।

ড. আনিচুর রহমানের তথ্য মতে, প্রাকৃতিক উৎস থেকে মা ইলিশ সংগ্রহ করে প্রজনন করা যা কি না তা নিয়ে গবেষণা চলছে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণের জন্য ইলিশ খাঁচায় রেখে ট্রায়াল চলছে। পুকুরে ইলিশ চাষের প্রয়োজন নেই মনে করেন ওই ইলিশ গবেষক। ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারলে এবং পরবর্তীতে ওই জাটকা রক্ষা করা গেলে দেশ ইলিশে সয়লাব হবে বলে মনে করেন তিনি
এদিকে প্রজনন মৌসুম শেষ হওয়ার পর বাগেরহাটের কেবি বাজার মৎস্য পাইকারি আড়তে গিয়ে ইলিশের সরবারহ দেখা গেছে। পিকআপ এবং মোটরসাইকেলযোগে ইলিশ আসছে আড়তে। ছোট-বড় বিভিন্ন সাইজের ইলিশের দেখা গেছে। ক্রেতাদেরও উপচে পড়া ভিড়। ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রামের ওজনের প্রতিকেজি ইলিশ ৩৫০ টাকা এবং ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতিকেজি ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। যে সব জেলেরা ইলিশ ধরতে তাদের ট্রলার নিয়ে সোমবার ভোরে সাগরে গেছে তাদের ফিরে আসতে আরো এক সপ্তাহ লাগবে বলে জেলে সুত্র জানায়।

বাগেরহাট উপকূলীয় মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি শেখ ইদ্রিস আলী জানান,  জাটকা রক্ষায় জেলেদের সচেতন হতে হবে এবং আইনশৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনীর সদস্যদের কঠোর ভাবে দ্বায়িত্ব পালন করতে হবে। হাট-বাজার এবং আড়তে যাতে কোনো অবস্থাতেই জাটকা বিক্রি না হয় সে দিকটা করা নজরদারি করার কথা জানালেন ওই নেতা।
সমুদ্রগামী জেলে শরণখোলা উপজেলার রফিকুল ইসলাম ও আবু তালেব শেখ জানান, কিছু জেলে আছে যারা ছোট ফাঁসের জাল নিয়ে সাগরে যায়। ওই জালে ছোটবড় সব সাইজের মাছ ধরা পড়ে। ছোটফাঁসের জাল যাতে কেউ নিতে না পারে এজন্য আইনশৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনীর সদস্যদের নজরদারি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি যে আট মাস জাটকা ধরা বন্ধ থাকবে ওই সময় যারা সাগরে না যাবে তাদের প্রত্যেককে খাদ্য সহয়তা দিতে হবে।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে জানান, জাটকা ধরা সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ করতে হলে যে সব মিল-কারখানায় ছোট ফাঁসের জাল উৎপাদন হয় তা বন্ধ করতে হবে। সরকার যদি ছোট ফাঁসের জাল উৎপাদন বন্ধ করতে পারে তা হলে জেলেরা ছোট ফাঁসের জাল না পেলে জাটকা ধরতে পারবে না। আর জাটকা ধরা বন্ধ করা গেলে ইলিশ মৌসুমে জেলেদের জালে প্রচুর পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়বে।

Please Share This Post in Your Social Media




© All rights reserved © 2017 Asiansangbad.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com