লক্ষ্মীপুরের রায়পুর মাতৃছায়া হাসপাতালে ভুল রিপোর্ট ও প্রসূতির অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মানববন্ধনসহ পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়

অ আ আবীর আকাশ,লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি : লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার পৌরশহরে অবস্থিত মাতৃছায়া হাসাপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে জীবিত গর্ভজাত সন্তানকে আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে মৃত ঘোষণা করে এবরশনের জন্য ঔষধ সেবন করানো ও প্রসূতি মায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী ও সাধারন নাগরিকদের মানববন্ধন এবং সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

এদিকে হাসপাতাল কতৃপক্ষ ঘটনা দুইটির ব্যাখ্যা দিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করে। অপরদিকে ভুক্তভোগী পরিবার ভুল রিপোর্টের ঘটনার বিচার চেয়ে মানববন্ধন,
স্বাস্থ্য মন্ত্রী,স্বাস্থ্য সচিব,স্বাস্থ্য ডিজি, জেলা প্রশাসক ও সিভিলসার্জন বরাবর অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন।

জীবিত গর্ভজাত সন্তানকে মৃত ঘোষণার প্রতিবাদে ভুক্তভোগী পরিবার ১২ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনের আআয়োজন ককরেন। সংবাদ সম্মেলনে জাকির হোসেন মিজি লিখিত অভিযোগে বলেন `গত ১লা এপ্রিল আমার ভাতিজি আমেনা বেগমকে রায়পুর মাতৃছায়া হাসপাতালে ডাঃ শামীমা নাসরিনের নিকট নিয়ে গেলে তিনি আল্ট্রাসনোগ্রাফ করার জন্য বলেন। আমরা ডাক্তারের কথামতো আল্ট্রাসনোগ্রাফ করায়ে আনলে তিনি বাচ্চার বয়স ৭ মাস প্লাস বলে একটা প্রেসক্রিপশন লিখে দেন।আমরা রোগীকে ডাক্তারের কথামতো ঔষধ খাওয়াতে থাকি।এতে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় আমরা আবার ডাক্তার শামীমা নাসরিনের নিকট নিয়ে গেলে পূণরায় আল্ট্রাসনোগ্রাফ করার কথা বলে।আমরা তা করাই। সেখানো রিপোর্ট প্রদান করা হয় বাচ্চা মৃত, দ্রত ডিএনসি করাতে হবে।আমরা এতে রাজী না হওয়ায় ডাক্তার শামীমা নাসরিন তিনি রোগীকে গর্ভজাত সন্তান বের হওয়ার জন্য ঔষধ লিখে দেন।আমরা রোগীর অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ঢাকা ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপালের ডাঃ ফেরদৌস আরা ভানু কাকলিকে দেখালে তিনি আবারো আল্ট্রাসনোগ্রাফ করার জন্য বলেন। রিপোর্ট দেখে তিনি বলেন বাচ্চা ভালো আছে,হার্টবিট ১৬১বিপিএম।এখন কথা হলো রায়পুর মাতৃছায়া হাসপাতালের আল্ট্রাসনোগ্রাফ ভুল, নাকি ডাঃ শামীমা নাসরিনের রিপোর্ট ভুল। আমরা কোনটা গ্রহণ করবো!
এসব ঘটনায় রোগীর বর্তমানে মানসিক বিপর্যস্ত, যে কোনো সময় রোগীর অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে গত ৯এপ্রিল রায়পুর পৌরশহরের দেনায়েতপুর গ্রামের ব্যবসায়ী সেলিম ববলেন- আমার ভাতিজি পলি আক্তারের সিজার অপারেশন হয় রায়পুর মাতৃছায়া হাসপাতালে । পরবর্তীতে জ্ঞান ফিরলে রোগীর শ্বাস কষ্ট দেখা দেয়।এসময় রোগীকে তাড়াহুড়া করে ঢাকায় নেয়ার পথে রোগী মারা যায়।

এদিকে ১১এপ্রিল বুধবার রায়পুর মাতৃছায়া হাসপাতালের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রহমান চৌধুরী তুহিন এক লিখিতপত্রে হাসপাতালের ব্যাখ্যা ও বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনের মধ্যদিয়ে তুলে ধরেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন -গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, অনলাইন ও প্রিন্ট সংবাদ মাধ্যমে আমাদের মাতৃছায়া হাসপাতাল (প্রা:) সম্পর্কে প্রচারিত ও প্রকাশিত বিভ্রান্তিকর তথ্যসমূহ আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে।
দীর্ঘ নয় বছর সুনামের সাথে আমরা চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছি। গত কিছুদিন পূর্বে আমেনা আক্তার নামের একজন রোগীর আলট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টে ভুল তথ্যের অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে রোগীর স্বজন ও কতিপয় ব্যক্তি কোনোরুপ যাচাই-বাছাই ছাড়াই একপেশেভাবে মাতৃছায়া হাসপাতালের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ ছড়ায়। কেউ কেউ হাসপাতাল পরিচালকদের ব্যক্তিগত আক্রমন করেও প্রচারণা চালান। এতে হাসপাতালটির সুনাম ক্ষুন্ন হয়। মানসিকভাবে আমরা আশাহত হয়ে পড়ি।
মূলত: আমেনা আক্তার রক্তক্ষরণ অবস্থায় আমাদের হাসপাতালের বহি:বিভাগে ডা: শামিমা নাসরিনের চেম্বারে আসেন। ডাক্তার সাহেব অবস্থা দেখে দ্রুত আসট্রাসনোগ্রাফি করে গর্ভের ০৭ সপ্তাহের ভ্রুনটি রক্ষার্থে এবং রক্তক্ষরণ বন্ধের জন্য প্রেসক্রিপশন প্রদান করেন। ওইসময় আসট্রাসনোগ্রাফিতে ভ্রুনটি অনেকটা দূর্বল দেখা গেছে জানিয়ে ঔষধ সেবনের পরে সমস্যা হলে আবার আসতে বলেন। আবার ০৭দিন পর রোগীর রক্তক্ষরণ পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় তারা রাত ১০টার দিকে ডাক্তার শামিমা নাসরিনের বাসায় যান। ডাক্তার সাহেব তাদেরকে আরো একটি আলট্রাসনোগ্রাফি করে ভ্রুনটির সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দেন। রোগীর স্বজনরা আবারও আমাদের হাসপাতালে মেডিকেল অফিসারের নিকট (সনোলোজিস্ট) আলট্রাসনোগ্রাফি করান। ওই রিপোটে ওনি ভ্রুনটি স্বয়সম্পূর্ণ নয় বলে একটি রিপোর্ট প্রদান করেন। ওই রিপোর্ট অনুযায়ী ডাক্তার শামিমা নাসরিন রোগীকে ভ্রুনটি অপসারণের জন্য পরামর্শ দেন। তারা অপসারণে ডিএনসি না করে ঔষধের মাধ্যমে করার পরামর্শ চান। ডাক্তার তাদেরকে সে মতে ঔষধ লিখে দেন। এরপর আর এ রোগী আমাদের হাসপাতাল বা ডাক্তার সাহেবের সাথে কোনো যোগাযোগ করেন নি। হঠাৎ করে আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পাই তারা ঢাকায় একটি হাসপাতালে আলট্রাসনোগ্রাফি করে ভ্রুনটি জীবিত আছে বলে এবং বয়স ৮ সপ্তাহ বলে প্রচারণা চালায়। তারা আমাদের হাসপাতালের বিরুদ্ধে নানান কুৎসা রটাতে থাকে। আমরা ফেসবুকের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে অভিযোগ ওঠায় আমাদের মেডিকেল অফিসার আল মামুনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।

০৯ এপ্রিল ২০১৮খ্রি: দেনায়েতপুর গ্রামের পলি আক্তার নামের এক গর্ভবতী নারী কার্ডিয়াক শক হওয়ার কারণে আমাদের হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন। ওইদিন সকাল ১১টার দিকে তিনি আমাদের হাসপাতালে ভর্তি হন। ডা: শামিমা নাসরিনের অধীনে তিনি সন্ধ্যা ৬টার দিকে সিজারের মাধ্যমে একটি ফুটফুটে পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। সাকসেসফুল সিজারের পর মা ও বাচ্চাকে বেডে আনা হয়। এরপর তিনি রাত ৭টার দিকে কার্ডিয়াক শকে আক্রান্ত হন। ওই সময় রোগীর স্বজনদের উপস্থিতিতে ডা: শামিমা নাসরিন ছাড়াও বিষয় সংশ্লিষ্ট আরো ০৫ জন ডাক্তার চিকিৎসা সেবা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় রেফার করেন। ওইরাত আনুমানিক ১টার দিকে এ্যাম্বুলেন্সে অবস্থার আরো অবনতিতে তাকে দাউদকান্দি নিউ এপেলো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ নিয়েও একটি অতি উৎসাহি মহল আমাদের হাসপাতালের নামে মিথ্যাচার শুরু করে। শুধুমাত্র আমাদের সুনাম ক্ষুন্ন করার জন্য ও ব্যক্তি আক্রোশে আমাদের নামে ফেসবুকে নানান কুৎসা ছড়িয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। পলি আক্তারের স্বজনরা আমাদের চিকিৎসা শুরুর শেষ পর্যন্ত ছিলেন। তারা আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও আমাদের ব্যক্তিগত সযোগিতায় আমাদেরকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তারাও আমাদের মতোই এ ধরণের মিথ্যাচারে ব্যথিত। কুচক্রিমহলের অপপ্রচারের নিন্দা জানাতে এবং প্রতিবাদে আজকের এই সংবাদ সম্মেলনে পলি আক্তারের স্বামীর ও পিতার পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত হয়েছেন।
উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতিতে আমরা পুরো বিষয়টি জানিয়ে লক্ষ্মীপুরের সিভিল সার্জন ডাক্তার মোস্তফা খালেদ আহমদ মহোদয়কে অবহিত করি। আমাদের মাধ্যমে জেনে ও ফেসবুক এবং পত্রিকায় খবর আসাা এ সংক্রান্ত বিষয়টি যাচাই করার জন্য আজ অর্থাৎ ১১ এপ্রিল ২০১৮খ্রি: দুপুরে আকস্মিক মাতৃছায়া হাসপাতাল (প্রা:) পরিদর্শন করে ঘটনা জানেন সিভিল সার্জন মহোদয়। ওই সময় তিনি সংক্ষুব্ধদের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা লিখিতভাবে দেওয়ার জন্য বলেন।

আমাদের প্রতিষ্ঠানটি একটি সেবামূলক চিকিৎসালয়। এটি যেমনি ব্যবসা, তেমনি আবার সমাজসেবারও একটি অংশ বলেই আমাদের বিশ্বাস। আমরা আমাদের সে বিশ্বাসকে সামনে রেখে সর্বদা রোগীর সেবায় নিজেদেরকে নিয়োজিত ওরাখি। এখানে প্রতি মাসে সহ¯্রাধিক রোগী চিকিৎসা নেয়। এদের অধিকাংশই রোগ মুক্তি পান বলে আমাদের বিশ্বাস। এতোবড় চিকিৎসা কার্যক্রমে আমাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ২/১টি ঘটনা ও ত্রুটি থাকার সম্ভাবনা যে নেই সেটি আমরা কখনোই বলিনি। কিন্তু আমরা বরাবরই আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ। এতোকিছুর পরও আমরা বরাবরই আপনাদের ও সমাজের সকলের কাছ থেকে ভালো কাজে উৎসাহ এবং পরামর্শ কামনা করি। একই সাথে চিকিৎসা কাজে যেকোন পরামর্শ সর্বদাই আমাদের কাজে অগ্রগণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

অপরদিকে ভুক্তভোগী পরিবার ১১এপ্রিল বুধবার রায়পুর উপজেলা পরিষদের সামনে ভুল রিপোর্টের বিচারের দাবীতে মানববন্ধনসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রী,স্বাস্থ্য সচিব,স্বাস্থ্য ডিজি, জেলা প্রশাসক ও সিভিলসার্জন বরাবর অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন।

     এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..